গর্ভধারণ সময়ের জানা-অজানা তথ্য

★ গর্ভধারণ কারে কয়েকটি সাধারণ পরিবর্তন দেখা যায়।
সাধারণত গর্ভ গুরু হয় পরিপক্ব ডিম্ব ও একটি শুক্রের মিলনের ফলে। এ প্রক্রিয়াকে নিষিক্তকরণ বলে। সহবাসের সময় শুক্রকীট স্ত্রীর যোনিতে পতিত হয় এবং তা জরায়ুর ভিতর দিয়ে ডিম্ববাহী নালীর মধ্যে প্রবেশ করে পরিপক্ ডিম্বের সাথে মিলিত হয়ে ডিম্বকে নিষিক্ত করে এবং তা নিষিক্ত ডিম্ব ধীরে ধীরে নালী দিয়ে ৫-৭ দিন পর জরায়ুতে ফিরে আসে এবং গর্ভ সঞ্চার করে।

★একটি মহিলার ১২-১৫ বছর বছরের মধ্যেই তার মাসিক বা ঋতুচক্র শুরু হয় এবং৪৫-৪৯ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। প্রতি ২৮-৩১ দিন পর পর চক্রাকারে এ ঋতুচক্র চলে। প্রতিমাসে ডিম্বাশয় হতে একটি ডিম্ব পরিপক্ব হয়ে বের হয়ে আসে। দাপ্তত্য জীবন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সহবাসের ফলে পুরুষের শুক্রকীট জরায়ুর ভিতর দিয়ে ডিম্ববাহী নালীতে প্রবেশ করে এবং সেখানে ডিম্বের সাথে একত্রিত হয়ে বিম্বের সাথে নিষিক্ত হয়।এ নিষিক্তকরণ হবার ফলে ভ্রণের সৃষ্টি হয় একেই গর্ভধারণ বলে।

★ মনে রাখতে হবে
জরায়ুর উচ্চতা ১২ সম্পাহে সিমফাইসি পিউবিস পর্যন্ত হয়, তারপর জরায়ুর উচ্চতা প্রতি ১৫ দিনে ১ ইঞ্চি বৃদ্ধি পায়, ২৪ সপ্তাহে নাভির ঠিক উপরে উঠে ৩৬ সপ্তাহে প্রসেস পর্যন্ত চলে যায়। গর্ভের শেষ চার সপ্তাহে বাচ্চা প্রসবের জন্য নিচে নেমে আসাতে জরায়ুর উচ্চতা কিছুটা কমে যায়।

★★গর্ভলক্ষণ★★

★ প্রথম ৩মাস বা ১২ সপ্তাহ

১। মাসিক বন্ধ হওয়া সন্তান গর্ভে আসার পর পরই মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। হঠাৎ ২-৪ টি মহিলা পাওয়া যায় যাদের গর্ভধারণের পরও প্রতিমাসে নিয়মিত মাসিক হয়ে থাকে।
২।বমি বমি ভাব
৩। ঘন ঘন মুত্রবেগ
৪।স্তনের আকার বৃদ্ধি ও বর্ণ পরিবর্তন। স্তনের ভারবোধ হয় এবং এরিওলাব রঙ গাঢ় হতে থাকে।
৫। জরায়ু পরীক্ষা করলে জরায়ুর মুখে ফোলা মতন এবং আকার বৃদ্ধি পাওয়া দেখা যাবে ও চাপ দিলে নরম বুঝা যাবে।
৬। ভালবা ও ভেজাইনার রঙ প্রায় নীলাভ দেখায়।
৭। প্রেগন্যান্সি টেস্ট করলে বুঝা যাবে।
৮। জরায়ুর আন্ট্রসনোগ্রাফী করলে শিশুর ছবি দেখা যায়

★ দ্বিতীয় ৩ মাস বা ১২-২৪ সপ্তাহ

১। মাসিক বন্ধ বা বমিও প্রায়ই বন্ধ হয়ে যায়্
২। গর্ভস্ত শিশুর নড়ানাড়া এবং মাঝে মাঝে নড়াচড়া অনুভব করা যায়।
৩। স্তন ( Breast) আরো বেশি পরিবর্তন দেখা যায়। স্তনের সম্মুখ ভাগের আয়তনের বৃদ্ধি ও বোটার নিচে চারিদিকে রং গাঢ় হতে থাকে। তার উপর দিয়ে ছোট ছোট দানার মতন (Montagomary tubercles) এর স্ফীতি দেখা যাবে।
৪। জরায়ুর বৃদ্ধি
(Enlargement of Utras): চিত্র অনুযায়ী পরীক্ষা করলে দেখা যাবে জরায়ুর সম্মুখভাগ নরম ও ফোলা মতন(Bulked) এবং স্পন্দন পাওয়া যাবে। এ পরীক্ষাটিকে হেগারস সাইন Hegars sign) বলে।
৫। নিচ পেটের লিনিয়া নাইরা ( কালো লম্ব রেখার মত দাগ) স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
৬। গর্ভস্ত শিশুর নড়াচড়া পাওয়া যাবে।
৭। পায়ে পানি আসতে পারে।
৮। এক্স-রে পরীক্ষা করলে শিশুর ছবি দেখা যাবে।

★ তৃতীয় ৩ মাস বা ২৪-৪০ সপ্তাহ

১। পায়ে পানি আসতে পারে
২। ব্যথাহীন জরায়ুর সংকোচন যা হাত দিয়ে বুঝা যাবে।
৩। ভ্রণস্ত শিশুর নড়াচড়া বেশি হবে এবং পেটে উপরিভাগে হাত দিয়ে বুলালে শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বুঝা যাবে।

★ প্রসব পূর্ব গর্ভবতীর পরিচর্যা

১। খাদ্যের উপর বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে যাতে মায়ে পাশা পাশি শিশুর বৃদ্ধিতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে

২। শাক-সবজি , ফলমুল প্রচুর পরিমানে খাওয়া উচিত।

৩। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে।

৪। দৈনন্দিন কাজ কর্ম ও বিশ্রাম নিতে হবে আর খেয়াল রাখতে হবে গর্ভের শেষ ৩ মাস যেন কোন ভারি কাজ না করে।

৫। স্বাভাবিক গর্ভধারণের শেষে ১-২ মাস স্বামী-স্ত্রীর মিলন থেকে বিরত থাকা উচিত।

৬। গর্ভবর্ত মায়ের টিটেনাস টকসয়েড ইনজেকশন (টি.টি) নেয়া জরুরি।এতে মা ও শিশু ধনুষ্টংকার রোগ থেকে সুরক্ষা রাখবে।গর্ভবস্থায় ১৬-১৮ সপ্তাতে ১ম ডোজ, ২০-২৪ সপ্তাহে ২য় ডোজ এবং ৩২-৩৬ সপ্তাহে ৩য় ডোজ টি.টি ইনজেকশন নিতে হবে।

৭। সব ধরনের ঔষধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে।

৮। প্রতিনিয়ত শরীরের ওজন, রক্তের চাপ, মুত্র পরীক্ষা প্রতি সপ্তাহে করতে হবে।

৯। গর্ভবতীর যে কোনো রকম অসুবিধায় অত্যন্ত গরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে বিভিন্ন ব্যথা ও তার প্রতিকার

গর্ভাবস্থায় অধিকাংশ সময়েই নারীদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ব্যাথার কথা শোনা যায়। এসকল ব্যাথা মাতৃত্বকালীন সময়কে আরও কঠিন করে তোলে। কিন্তু এই সময় না বুঝে কখনোই কোন প্রকার পেইন কিলার খাওয়া উচিত নয়। আর ফলে মা ও শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।

কোমরে ব্যথাঃ শিশুর বৃদ্ধির সাথে সাথে মায়ের পেটেরও যখন বৃদ্ধি ঘটে, তখন একজন মায়ের হাঁটা চলা ও বিভিন্ন কাজের জন্য কোমরে ব্যাথা অনুভুত হয়। এসময় হাড়ের জয়েন্টের সমস্যাও কোমরে ব্যাথার কারন হিসেবে গণ্য হতে পারে।

উপায়ঃ নিজের শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নেয়া শুরু করুন। কাজের সময় পেটের উপর কোন চাপ প্রদান করা যাবে না। মেরুদন্ড সোজা রেখে হাঁটার চেষ্টা করতে হবে। নিচে কিছু ঔষধের নাম দেওয়া আছে সেগুলো খেতে পারেন।

পায়ের ব্যথাঃ গর্ভাবস্থায় লিগামেন্ট হালকা হয়ে যাবার কারনে পায়ের ব্যাথা অনুভুত হয়। গর্ভকালীন সময়ের কিছু হরমোন আর জন্য দায়ী। তাছাড়াও অতিরিক্ত ওজনের কারনেও এমনটা হতে পারে।

উপায়ঃ এসময় একটি বিশেষ ধরনের জুতা আছে, যা ব্যাথা কমাতে কার্যকরী। দিনের বিভিন্ন সময়ে কাজের ফাঁকে পায়ের বিশ্রাম দিন। কিছুক্ষন পর পর পায়ের উপর চাপ কমাতে, পা ঝুলিয়ে বসুন। তবে কখনোই খুব বেশী শুয়ে বসে থাকা যাবে না, এতে করে পায়ে পানি চলে আসতে পারে।

স্তনের আকৃতিতে অস্বাভাবিকতাঃ গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক কারনেই স্তনের আকৃতিগত পরিবর্তন দেখা দেয়। এসময় শিশুকে দুধ খাওয়ানোর উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য স্তনের আকৃতি পরিবর্তন হয়। মায়ের স্তনের দুধে কলোস্ট্রাম নামক উপাদান তৈরি হয় বলে এই পরিবর্তন দেখা দেয়। এসময় মা বেশ অস্বস্তিবোধ করে।

উপায়ঃ আরামদায়ক সাইজের অন্তর্বাস (ব্রা) কিছুটা স্বস্তি প্রদান করতে পারে।

পেটে গ্যাসঃ শিশুর বেড়ে উঠার কারনেই, গর্ভাবস্থার শেষের পর্যায়ে, মায়ের পেটে গ্যাস উৎপন্ন হয়। এই এসিডিটির কারনেই এসময় মা পেটের ব্যথায় ভুগে থাকে।

উপায়ঃ চিকিৎসকরা এমন সময় চুষে খাওয়া যায় এমন এন্টাসিড, কিংবা তরল এসিডিটির ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। আর ব্যথা যদি শিশুর নড়াচড়ার কারনে হয়, তবে মা সেটা সময়ের সাথে বুঝে নিতে পারবে।

মাথা ব্যথাঃ এসময় হরমোনের কারনে প্রচুর মাথা ব্যাথা হতে পারে। যেসব মায়েরা পূর্ব থেকে চা, কফি খেয়ে অভ্যস্ত তাঁদের হঠাৎ ক্যাফেইনের শূন্যতা হলে মাথা ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।

উপায়ঃ চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ নিয়ে ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহন করা যেতে পারে। এছাড়াও স্কাল্প ম্যসাজ, বিশ্রাম ও শরীর শান্ত করার বিভিন্ন ব্যায়াম এই সমস্যা থেকে মা’কে মুক্তি দিতে পারে।

গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের শারীরিক নানান পরিবর্তন দেখা দেয়ার কারনে, বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। কিন্তু এতে ভয় পাবার কিছুই নেই, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহন করুন আর সুস্থ থাকুন।

 



Comments




Write a new comment:




//